স্বেচ্ছাসেবকতা শুধু সময় বা দক্ষতার বিনিময় নয়-আমান্ডা খোজি মুকওয়াশি

স্বেচ্ছাসেবকতা শুধু সময় বা দক্ষতার বিনিময় নয়-আমান্ডা খোজি মুকওয়াশি

স্বেচ্ছাসেবকতা শুধু সময় বা দক্ষতার বিনিময় নয়-আমান্ডা খোজি মুকওয়াশি

স্বেচ্ছাসেবকতা শুধু সময় বা দক্ষতার বিনিময় নয়। এটি আসলে সম্পর্কের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—সেই সামাজিক বন্ধনের মধ্যে, যা কমিউনিটির ভেতরে ‘উবুন্টু’ (ubuntu)-এর চেতনাকে লালন করে। এখানে দেওয়া ও নেওয়া একসাথে মিলিত হয়ে গড়ে তোলে বিশ্বাস, ভাগাভাগি মানবতা এবং সম্মিলিত ক্ষমতায়ন। এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন এক বিশ্বে, যা নানা সংকটের মধ্যে গড়ে উঠছে—দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক বিভাজন। এসব পরিস্থিতিতে মানুষে মানুষে বিশ্বাস ও সম্মিলিতভাবে কাজ করার ক্ষমতা একদিকে যেমন চাপে পড়ছে, অন্যদিকে তেমনি তা আগের চেয়ে আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে।

তবুও, প্রায়ই স্বেচ্ছাসেবকতাকে সীমিতভাবে দেখা হয়—যেন এটি শুধু সময়, দক্ষতা বা সম্পদের বিনিময়, যেখানে যাদের আছে তারা দেয় এবং যাদের নেই তারা গ্রহণ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত উন্নয়ন সূচক ও রিপোর্টিং ব্যবস্থার সঙ্গে সহজে মিলে যায়, কিন্তু এটি একটি মৌলিক বিষয়কে উপেক্ষা করে। মূলত, স্বেচ্ছাসেবকতা সম্পর্কনির্ভর। এটি দেখায় কীভাবে ব্যক্তি ও কমিউনিটি একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, বিশেষ করে অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনের মুহূর্তগুলোতে।

এটি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। অনেক কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাসেবকতা দৈনন্দিন জীবনের অংশ, এবং যখন কোনো ব্যবস্থা চাপে পড়ে তখন এটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। যেমন—প্রচণ্ড আবহাওয়ার সময় একজন প্রতিবেশী বয়স্ক ব্যক্তির খোঁজখবর নেয়। বন্যার পর তরুণরা একত্র হয়ে আশপাশ পরিষ্কার করে। হঠাৎ ক্ষতির মুখে পড়া পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় দলগুলো এগিয়ে আসে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতার চিত্র দেখা গেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করেছে। এসব কাজ সাধারণত সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, কিন্তু এগুলোই কমিউনিটির টিকে থাকার মূল শক্তি।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব চর্চা সম্পর্কের গভীরতা তৈরি করে—মানুষ কীভাবে দায়িত্ব, যত্ন ও অন্তর্ভুক্তির ধারণা বুঝতে শেখে। এটি পারস্পরিক স্বীকৃতি ও নির্ভরতার অনুভূতি গড়ে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে এটি ‘উবুন্টু’ ধারণার মাধ্যমে প্রকাশ পায়—যেখানে মনে করা হয়, আমাদের মানবতা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, এবং দেওয়া-নেওয়া আলাদা কোনো ভূমিকা নয়, বরং একটি অবিচ্ছিন্ন ও যৌথ অভিজ্ঞতার অংশ।

যদিও এই ধারণার শিকড় আফ্রিকান দর্শনে, এটি বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে প্রতিধ্বনিত হয়। যেমন—আদিবাসী দৃষ্টিভঙ্গিতে পারস্পরিক নির্ভরতার ধারণা, ল্যাটিন আমেরিকার ‘বুয়েন ভিভির’ (buen vivir) ঐতিহ্য, এবং উন্নয়ন চিন্তাধারায় ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকৃত হচ্ছে যে মানুষের কল্যাণ মূলত সম্পর্কনির্ভর। ধীরে ধীরে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী আলোচনাতেও এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যেখানে সামাজিক সংহতি, বিশ্বাস এবং অন্তর্ভুক্তিকে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে বাস্তবে উন্নয়ন কার্যক্রমের অনেকটাই এখনও লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হয়। সহায়তা সাধারণত নির্দিষ্ট ভূমিকার ভিত্তিতে সাজানো হয়—যেখানে সাহায্যপ্রার্থীদের তাদের দুর্বলতা প্রমাণ করতে হয়, আর সহায়তাকারীরা বাহ্যিক অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচিত হন, যাদের অবদান নথিভুক্ত করা হয়। পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থাগুলোও বেশি গুরুত্ব দেয় পরিমাপযোগ্য ফলাফলে, ফলে সম্পর্কভিত্তিক দিকগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।

কমিউনিটি-নির্ভর উন্নয়ন এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালিত মানবিক কার্যক্রম থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যখন মানুষকে শুধু উপকারভোগী হিসেবে দেখা হয়, অংশীদার হিসেবে নয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাস ও মালিকানাবোধ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, যে পদ্ধতিগুলো অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকে গুরুত্ব দেয়, সেগুলো সাধারণত স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং বাস্তবে বেশি টেকসই প্রমাণিত হয়। উন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণাও দেখায় যে বিশ্বাস, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় স্থিতিস্থাপকতা ও কার্যকারিতার প্রধান নির্ধারক।

একই সঙ্গে, একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে: যা মাপা হয় না, তা অনেক সময় যথাযথভাবে স্বীকৃতিও পায় না। প্রচলিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাগুলো সাধারণত কী প্রদান করা হয়েছে তা ধরতে পারে, কিন্তু মানুষে মানুষে কী গড়ে উঠেছে তা নয়। অথচ এই অদৃশ্য উপাদানগুলো—বিশ্বাস, পারস্পরিকতা এবং সামাজিক সংহতি—সম্মিলিত কাজকে সম্ভব করে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ধরে রাখতে সাহায্য করে।

এখানেই স্বেচ্ছাসেবকতার পরিমাপের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বেচ্ছাসেবকতাকে কীভাবে বোঝা ও মূল্যায়ন করা হবে, তা শুধু একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি একটি ধারণাগত পরিবর্তনের দাবি রাখে। প্রয়োজন এমন পদ্ধতির, যা শুধু কার্যক্রমের সংখ্যা গণনা নয়, বরং স্বেচ্ছাসেবকতা কীভাবে সম্পর্ক, অন্তর্ভুক্তি এবং কমিউনিটির স্থিতিস্থাপকতায় অবদান রাখে, তা প্রতিফলিত করে।

এক্ষেত্রে একটি বড় ঘাটতি হলো অনানুষ্ঠানিক স্বেচ্ছাসেবকতার সীমিত দৃশ্যমানতা। অথচ এটি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে কমিউনিটিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কিন্তু সরকারি তথ্য-উপাত্তে তা যথেষ্টভাবে ধরা পড়ে না।

অনিশ্চয়তা ও বিচ্ছিন্নতায় ভরা এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিটির ভেতরে ও কমিউনিটির মধ্যে সম্পর্কের শক্তি উন্নয়নের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়—বরং এটি উন্নয়নের একটি পূর্বশর্ত।

উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা খাতের জন্য এটি দৃষ্টিভঙ্গির একটি পরিবর্তন দাবি করে। এর অর্থ হলো, স্বেচ্ছাসেবকতাকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে নয়, বরং সমাজ কীভাবে নিজেকে সংগঠিত, সহায়তা ও টিকিয়ে রাখে তার একটি মূল অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। একই সঙ্গে এমন পদ্ধতি তৈরি করা, যা বিদ্যমান সংহতিকে দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করে।

যদি উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে রূপান্তরমূলক হতে চায়, তবে তা কেবল লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তাকে সংযোগের দিকে এগোতে হবে। স্বেচ্ছাসেবকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্থায়ী পরিবর্তন শুধু কী দেওয়া হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে না, বরং কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তার ওপরও নির্ভর করে।

কারণ শেষ পর্যন্ত, এই সম্পর্কগুলোই—যা বিশ্বাস, মর্যাদা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে—নির্ধারণ করে একটি কমিউনিটি কতটা টিকে থাকতে পারে, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এবং একসাথে একটি যৌথ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।

আমান্ডা খোজি মুকওয়াশি বর্তমানে অ্যাঙ্গোলায় জাতিসংঘের রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে UNV এর ওয়েবসাইডে একটি ব্লগ লেখেন, আমরা বাংলায় আপনাদের জন্য লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশ করলাম।

মূল লেখা পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.unv.org/blog/bound-together-ubuntu-and-volunteerism

Leave a reply

Shwapno Dakho is a non-profit organization to support people across the country and keep an eye in the future Support.

Explore

Contact

Ma Villa 580/01, Opposite side of IT Park, Piyari Mohan Road, Shankarpur, Jashore

Support

With enthusiastic employees and volunteers, we are ready to support you no matter any time.

© Copyright 2024 by Shwapno Dakho Foundation