স্বপ্নদেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থা – যশোরের আলোকবর্তিকা এক মানবিক সংগঠন
সূচনাঃ ২০০৯ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী যশোরের কিছু যুবদের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে স্বপ্নদেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থা। ২০১০ সালে সুসংগঠিত হয়ে একটি ছোট অফিস নিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা আমাদের। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র, পরিবেশ, তথ্য ও প্রযুক্তি এবং সচেতনতা নিয়ে কাজ করছি আমরা। শিশু, নারী ও যুবকদের যুগোপযোগী আধুনিক যশোর বিনির্মাণে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭১ সালে আমাদের এই সোনার দেশটিকে স্বাধীন করতে সৃষ্টি করা হয়েছিল ১১টি সেক্টর। সেই অসীম সৃষ্টি’র মূল চেতনা নিয়ে আমরা সৃষ্টি করেছি ১১ টি বিভাগ। নিম্নে সে সকল বিভাগের বর্ণনা দেওয়া হল।
ছোট শুরু, বড় স্বপ্ন
যশোরের কোনো অলিতে-গলিতে হয়তো একদিন দেখা যেত একদল তরুণ, যারা ব্যস্ত অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে। তারা ছিল না কোনো বড় এনজিও, তাদের পেছনে ছিল না বিশাল তহবিল। কিন্তু ছিল এক অদম্য মানবিকতা আর অসীম ভালোবাসা। এই ভালোবাসা থেকেই জন্ম স্বপ্নদেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থা।
এই সংস্থা গড়ে উঠেছে মূলত তরুণদের হাত ধরে, যারা নিজেকে শুধুই দর্শক নয়, সমাজের পরিবর্তনকারী হিসেবে দেখতে চায়। তারা বিশ্বাস করে—মানুষ মানুষের জন্য, আর এই নীতিকথাকে তারা রূপ দিয়েছে বাস্তব কর্মকাণ্ডে।
স্বপ্নদেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থার কার্যক্রম সমূহঃ
স্বপ্নদেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থা শুধুই একটা সংগঠন নয়, এটি এক ধরনের আন্দোলন—সচেতনতা, সহানুভূতি আর স্বেচ্ছাসেবার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
তারা নিয়মিত যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করে:
১. জোনাকির মেলা পাঠশালা:
এই পাঠশালার মাধ্যমে আমরা যশোরের খড়কি এলাকার বস্তিতে শিশুদেরকে বিনামূল্যে চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, নাচ, গান, রচনা লেখা, কবিতা লেখাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকি। তাদেরকে নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি স্কুলে যেতে উদ্বুদ্ধ করে চলেছি। যার ফলে ঐ এলাকায় এখন স্কুলগামী শিশুদের সংখ্যা আগের চেয়ে দ্বিগুণ হারে বেড়েছে।
২. স্বপ্নদেখো প্রতিবন্ধী স্কুল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রঃ
প্রতিবন্ধীদের স্থির জীবনে গতি সঞ্চার করতে এগিয়ে চলেছে স্বপ্নদেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থা। যশোরের ২ নং ইছালী ইউনিয়নে দুইজন মহৎ ডাক্তারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রতিবন্ধীদের সেবা ও উন্নয়নে কাজ করে চলেছে। আমরা প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দুইজন অভিজ্ঞ ডাক্তারকে সাথে নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রোগী দেখেন স্বপ্নদেখোর সদস্যরা।
৩. স্বপ্নদেখো গণ–পাঠাগারঃ
১২০০ (বার শতাধিক) বই নিয়ে চলছে আমাদের এই পাঠাগার। নিয়মিত বই পাঠ, কুইজ, রচনা লেখা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছে আমাদের পাঠাগার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রালয়ের গণ-গ্রন্থাগার কর্তৃক অনুমোদিত এই পাঠাগারে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বই পড়তে আসেন।
৪. এ্যাবাকাস কম্পিউটার এন্ড ট্রেনিং সেন্টারঃ
যুবকদেরকে তথ্য ও প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং যোগ্য করে গড়ে তুলতে আমরা আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে তুলেছি এই ট্রেনিং সেন্টার। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের সিলেবাসে আমরা যুবকদেরকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদান করাচ্ছি। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী অফিস অ্যাপ্লিকেশন ও ডাটাবেজ প্রোগ্রামিং কোর্সে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাচে ২৬৫ (দুইশত পঁয়ষট্টি) জনকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। বর্তমানে ৩৫ জন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। এই ট্রেনিং সেন্টার থেকে ৩১ জন ব্যক্তির কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তারা অনেকেই এ্যাবাকাস কম্পিউটার এন্ড ট্রেনিং সেন্টারে এসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের কোর্স ছাড়াও আমরা গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, আউট সোর্সিং এ কোর্স করানো হয়। যুবকদেরকে ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ শেখানোর মাধ্যমে তাদেরকে ইনকামের মাধ্যম সৃষ্টি করে দেওয়া এবং গরীব বাচাদেরকে ফ্রি কম্পিউটার শেখানোর কাজ করে চলেছে এই প্রতিষ্ঠান।
৫. সমাজসেবা উন্নয়ন বিভাগঃ
সমাজের উন্নয়ন কাজ করে যাচ্ছে সমাজসেবা উন্নয়ন বিভাগ। স্বপ্নদেখর সমাজসেবকগণ সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মাঝে শীত বস্ত্র বিতরন, শিক্ষা উপকরণ বিতরন, পাঠদান কার্যক্রম, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি প্রশিক্ষণ, দুর্যোগপীড়িত অঞ্চলে ত্রাণ বিতরন কার্যক্রমসহ নানামুখী সমাজসেবামূলক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালনা করে আসছে।
৬. খাদ্য ও কৃষি বিভাগঃ
এই বিভাগের মাধ্যমে শহরের শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদেরকে আমরা মাঠে কৃষকের সাথে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য শিক্ষিত যুবরা যেন কৃষকের পাশে এসে দাঁড়ায় ও কৃষি নিয়ে কাজ করে। প্রতিবছর চারবার আমরা শহরের যুব ও কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে মাঠে কাজ করি। সর্ব মহল থেকে আমরা ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছি। ইতোমধ্যে এই কার্যক্রমের উপর স্থানীয় পত্রিকায় একাধিক বার ও দৈনিক কালের কণ্ঠে একবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কার্যক্রমটি এখনো চলমান।
৭. মাইকেল মধুসূদন ডিবেট ফেডারেশন (এমএমডিএফ):
এমএমডিএফ স্বপ্নদেখোর সবচেয়ে বড় বিভাগের একটি। যেখানে বিতর্ক শিল্পের চর্চা ও তাত্ত্বিক তৈরিতে কাজ করা হয়। ২০০৯ সাল থেকেই আমরা এই বিভাগটি নিয়ে কাজ করছি। এ পর্যন্ত ৩৬ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫০০ তেতাল্লিশ শত শিক্ষার্থীদের আমরা বিতর্ক শিখিয়েছি। আমাদের বিচারিক তুলনা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন,শ্রেষ্ঠ বক্তা হয়েছেন। আমাদের একজন বিচারিক ওপেন ক্লাব অব বাংলাদেশ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন,শ্রেষ্ঠ বক্তা হয়েছেন। ২০১৮ সালে আমরা মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির হাত থেকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিতর্কিক সংগঠনের পুরস্কার গ্রহণ করি। এখন আমরা যশোরের ৪টি উপজেলাতে বিতর্ক নিয়ে কাজ করছি।
৮. কম্পিউটার প্রজন্ম বিভাগঃ
এই বিভাগের মাধ্যমে ২০১৩ সাল থেকে যশোরের ৩ নং ইছালী ইউনিয়নের ০৮ (আট) টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নয় শতাধিক শিশু শিক্ষার্থীদের মাঝে কম্পিউটারে হাতে খড়ি দিয়েছি। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাথমিক স্কুলে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে আমরা কম্পিউটারের প্রাথমিক জ্ঞান বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছি। সক্ষম হয়েছি তাদের মাঝে বড় হওয়ার স্বপ্নের বীজ বপন করতে। এই কার্যক্রম এখনো চলমান…!
৯. স্বপ্নদেখো ব্লাড ব্যাংকঃ
এই বিভাগের মাধ্যমে আমরা নিয়মিত রক্তদান করে আসছি। এ পর্যন্ত আমরা ১৯০ ব্যাগ রক্তদান করতে সক্ষম হয়েছি। এবং ছয় শতাধিক মানুষকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছি।
১০. গার্বেজ রিসাইক্লিং:
নিয়মিতভাবে এই সমাজসেবা মূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশ উন্নয়নেও কাজ করছে স্বপদেখো। বর্তমানে একটি অনন্য ইনোভেশন গার্বেজ রিসাইক্লিং নিয়ে কাজ করছে স্বপদেখোর গার্বেজ রিসাইক্লিং বিভাগ। এছাড়াও এ বিভাগের অধীনে বৃক্ষ রোপণ, মৎস্য অবমুক্তকরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান সহ নানা বিভাগ। কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালনা করছে স্বপদেখোর গার্বেজ রিসাইক্লিং বিভাগ।
১১. স্বপ্নবুনি হস্তশিল্পঃ
জোনাকির মেলা পাঠশালার শিশু শিক্ষার্থীদের অভিভাবক অর্থাৎ তাদের মা এবং বড় বোনদেরকে স্বাবলম্বী করতে এই বিভাগের মাধ্যমে আমরা তাদেরকে স্বল্পমূল্যে দর্জি প্রশিক্ষণ প্রদান করি। তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন কলেজের মেয়ে শিক্ষার্থীরা এই বিভাগ থেকে এখন দর্জি, ব্লক-বাটিক, কারু শিল্পের বিভিন্ন কাজ শিখছে। এই পর্যন্ত ৪২৩ (চারশত তেইশ) জনকে আমরা এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে পেরেছি। তারমধ্যে ১৭ (সতের) জনের বিভিন্ন ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জানার যুদ্ধঃ
এটি স্বপ্নদেখোর একটি নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যশোরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৫০০ (এক হাজার পাঁচশত) শিক্ষার্থীর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি।
এই প্রজেক্টের কিছু কার্যক্রম:
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক পাঠচক্র:
স্কুল, কলেজে মুক্তিযুদ্ধের বই পড়ে আলোচনা সভা।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময়:
মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ করে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনা।
মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ভ্রমণ ও সচিত্র প্রতিবেদন:
যশোর ও আশপাশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে ভ্রমণ আয়োজন।
চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা:
‘আমার চোখে মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ক শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা।
এই কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম শুধু ইতিহাস জানতে নয়, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়—যা আজকের সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
স্বপ্নদেখোর স্বেচ্ছাসেবক দল – হৃদয়ের সৈনিক
এই সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা। তারা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, অনেকেই চাকরি বা ব্যবসা করে, কিন্তু সময় পেলেই ছুটে আসে কাজ করতে।
কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ
“খাবার দাও, হাসি পাও” – রাস্তায় থাকা মানুষদের জন্য রান্না করা খাবার বিতরণ
“শীতার্তদের পাশে স্বপ্নদেখো” – কম্বল বিতরণ, ঠাণ্ডা পোশাক সংগ্রহ
“এক ফালি হাসি” – পথশিশুদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া
স্বপ্নদেখো কেন আলাদা?
শুধুই সহানুভূতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরিতে বিশ্বাসী
দান নয়, সম্পৃক্ততা গড়ে তোলে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রতিটি কর্মসূচির স্বচ্ছতা তুলে ধরা হয়
তরুণদের একত্রিত করে সমাজে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
স্বপ্নদেখো সংস্থা শুধু যশোর নয়, গোটা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের কর্মসূচি ছড়িয়ে দিতে চায়। তারা ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র, স্বাস্থ্য সহায়তা বুথ এবং মেয়েদের জন্য সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়তে চায়।
শেষ কথা
আমাদের সমাজে অনেক সমস্যা আছে, কিন্তু সমাধানের পথও আছে—যদি কেউ এগিয়ে আসে। স্বপ্নদেখো সেই মানুষগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে, যারা কথা বলে না, কাজ করে।
তারা আমাদের শেখায়—স্বেচ্ছাসেবা শুধু দায়িত্ব নয়, এটা ভালোবাসা।
তারা দেখিয়ে দেয়—পরিবর্তন করতে হলে নেতা হতে হয় না, মানুষ হলেই চলে।